অনুভূতিরও জীবন আছে, তার যত্ন নিতে হয় লাইফ News

অনুভূতিরও জীবন আছে, তার যত্ন নিতে হয়

পরিচিত এক আপুর বিয়ে হয়েছিল প্রবাসী ছেলের সাথে। বিয়ের কয়েক মাস পর তিনিও চলে যান স্বামীর কাছে। বছরখানের পর সেখানে তার কোল জুড়ে একটি ফুটফুটে সন্তান জন্ম নেয়। আর তার বছর দুয়েক পর স্বামীর সাথে অভিমান করে তিনি সেই সন্তানসহ দেশে চলে আসেন।

খুব সামান্য কারনে বা অকারণে যে তিনি স্বামীকে ত্যাগ করে বিদেশের চাক- চিক্য ছেড়ে শিশু সন্তান নিয়ে দেশে চলে আসেননি তা বুঝতে খুব বেশী কষ্ট করতে হয় না।


শুনেছিলাম উনার স্বামী প্রতিনিয়ত উনাকে নানারকম অত্যাচারে রাখতেন। ভদ্রলোকের প্রধান কাজ ছিল স্ত্রীর দোষ -ত্রুটি ধরা। অন্যের বউ এর রুপ- গুন তার চোখে বেশী ধরা পড়ত আর তিনি প্রতিনিয়ত নিজ স্ত্রীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। সন্তান জন্মাবার পরও নিজ স্ত্রীকে হেয় করার এই নোংরা অভ্যাস তিনি ত্যাগ করতে পারেননি বরং তা আরও বেড়ে গিয়েছিল। তিনি তাতে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে বহুদিন আগেই যে তার সীমা অতিক্রম করে ফেলেছেন হয়তো নিজেও বুঝতে পারেননি।

আপুটি শান্ত, ধৈর্যশীলা ছিলেন। তবে কিনা ধৈর্যেরও একটা শেষ সীমা থাকে আর তাই একটা পর্যায়ে অসহ্য হয়ে তিনি বাচ্চাসহ দেশে চলে এলেন।


তিনি ভদ্র - স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে, শিক্ষিতা । তার পরিবারও সব জেনে তাকে আর জোর করল না ফিরে যেতে। তবে তখনও তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়নি।


এভাবে কয়েক মাস কেঁটে গেল। স্বামী যখন নিশ্চিত হলেন স্ত্রী আর তার কাছে ফিরবেন না তখন হঠাৎ তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন হলো। যে স্ত্রী তার কাছে অযোগ্য ছিলেন, অসুন্দরী ছিলেন যার মধ্যে তিনি এতোদিন কোন গুনই খুঁজে পাননি হঠাৎ করে হারিয়ে ফেলে সেই মানুষটিই তার কাছে মহা মূল্যবান হয়ে গেল।... তাকে ছাড়া তার জীবন অর্থহীন হয়ে গেল। স্ত্রীকে ফিরে পেতে তিনি আপুর সব আত্মিয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ করে ভুল স্বীকার করে মাফ চাইতে লাগলেন। আপুটিরও আস্তে আস্তে মন গলল তিনি স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে রাজী হলেন।

যেদিন তিনি স্বামীর কাছে( আমেরিকা ) ফিরে যাবেন তার আগের দিন বিশেষ একটা কাজে ঢাকা তার মার বাসায় আমি উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি সেদিন ব্যস্ত ছিলেন কাপড়- চোপর গোছাচ্ছিলেন তবুও আমাকে দেখে অনেক গল্প করলেন । তবে স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার যে আনন্দ প্রতিটি মেয়ের মধ্যে দেখা যায় তা উনার মধ্যে দেখিনি। কেমন যেন অনুভূতি শুন্য রোবট মনে হলো ,যেন কেবল ফিরে যেতে হবে বলেই ফিরে যাওয়া। স্বামীর কথা একবারও তুললেন না। আসলে স্বামীটি প্রতিনিয়ত অসম্মান আর অবহেলা করে করে তার অনুভূতিগুলোকে হত্যা করেছিলেন অনেক আগেই ।.... জানি না মন থেকে তারা আর কখনো আগের মতো স্বাভাবিক হতে পেরেছিলেন কিনা!!

রক্তের সম্পর্ক আর স্বামী - স্ত্রীর সম্পর্কের বড় পার্থক্য হলো ভাই, বোন বা বাবা, মার সাথে যত বড় মনোমালিন্যই হোক না কেন তা পাঁচ বছর হোক বা দশ বছর হোক এক সময় হয়তো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে তবে স্বামী - স্ত্রীর সম্পর্কে একবার অশ্রদ্ধা বা ফাটঁল দেখা দিলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা ভীষণ কঠিন কাজ।

সম্পর্কের মধ্যে মনোমালিন্য অবশ্যই হতে পারে তবে পারস্পরিক সম্মানবোধ থাকাটা ভীষণ জরুরি। আপনার জীবনসংগীকে রেগে গিয়ে হলেও কখনো অন্যের স্বামী বা স্ত্রীর সাথে তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন। এটা ভয়াবহ খারাপ একটি অভ্যাস। প্রতিটি মানুষ আলাদা, প্রতিটি মানুষের নিজেস্ব কিছু স্বকীয়তা আছে । একই সাথে প্রতিটি মানুষ নিজ গুনে অনন্য, অসাধারণ । তবে তা দেখা বা বোঝার মতো মন থাকতে হয়।

মানুষের অনুভূতিকে যারা খুন করে তারাও খুনি। অনুভূতিকে খুন করা এমন অনেক খুনিকে আমি রোজ আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখি। অনুভূতিরও জীবন আছে। তার যত্ন নিতে হয়। প্রিয়জনের অনুভূতিকে বাচিঁয়ে রাখুন অকৃত্রিম ভালবাসা দিয়ে। অবহেলা আর অসম্মান দিয়ে তিলে তিলে যারা মানুষের অনুভূতিকে হত্যা করেও বুক ফুলিয়ে হাঁটে তাদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।।

©মাহবুবা আরিফ সুমি

Other News