রাজ্জাক ও কবরীর প্রেম আর বন্ধুত্ব বিনোদন News

রাজ্জাক ও কবরীর প্রেম আর বন্ধুত্ব

বাংলাদেশি সিনেমার পর্দায় ঈর্ষণীয় এক জুটি রাজ্জাক-কবরী। পর্দায় তাঁদের প্রেমময় সংলাপ পর্দার বাইরের দর্শকদের সব সময় ভীষণভাবে আন্দোলিত করেছে। প্রেমিক-প্রেমিকারা রাজ্জাক-কবরীর সেসব সংলাপ সব সময়ই নিজের মনে করেছেন।

দেশের সিনেমার অলিগলি ঘুরতে গিয়ে রাজ্জাক-কবরী জুটি নিজেরাও একসময় নিজেদের ভেতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন। নিজেদের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেম-ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের গল্প। আর তা ভক্তদের কাছে এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছিল যে তাঁরা নাকি এই পর্দা জুটির বিয়ে হলে ভালো হতো বলে মনে করতেন। রাজ্জাক-কবরী জুটির পর্দা ও পর্দার বাইরের সম্পর্ক একটি রহস্য। সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত আলাপে কবরীর কাছ থেকে বাংলাদেশি সিনেমার চিরস্মরণীয় এই জুটির বন্ধুত্ব, প্রেম ও ভালোবাসার গল্প জানার চেষ্টা ছিল। মিষ্টি মেয়েখ্যাত কবরী তা-ও আপন মনে বলে গেছেন।

 

বাংলাদেশি সিনেমার রাজ্জাক-কবরী জুটি যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলোড়ন তুলে যাচ্ছে, সেই রাজ্জাকের সঙ্গে প্রথম দেখায় নাকি কোনো অনুভূতিই হয়নি কবরীর। দুজনেই তখন নিজেদের মতো করে সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত। তাঁদের প্রথম দেখা হয়েছিল গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘যোগাযোগ’ নামের একটি সিনেমার সূত্র ধরেই। সেদিনই প্রথম রাজ্জাক ও কবরীর সামনাসামনি কথাবার্তা হয়। খাওয়াদাওয়া আর আড্ডাও চলে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সিনেমাটি আর তৈরি হয়নি।

 

নিজেদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক কবরী বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে “ময়নামতি” সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে। অভিনয় করতে গিয়ে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। একে অপরের কাছ থেকে শিখেছি। আমরা নিজেদের মধ্য ভাবের আদান-প্রদান করেছি। বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা এক্সচেঞ্জ করেছি। সিনেমার চরিত্র নিয়ে কথা বলেছি। এ রকম কাজ করতে গিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছে। বিষয়টি এমন না যে উনার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমার প্রেম হয়ে গেল, জুটি হয়ে গেল কিংবা বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এটা মোটেও তেমন নয়।’

 

রাজ্জাক ও কবরীকে কাজ করতে করতে একেকটি সিঁড়ি ওপরে উঠতে হয়েছে। এভাবেই তাঁদের মধ্যে একটি সময় দারুণ বোঝাপড়া তৈরি হয়। কাজের সময় পেশাদারির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত। দুজনেরই নাকি পেশার প্রতি শ্রদ্ধাও ছিল সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের সিনেমার স্বর্ণযুগে একটা বড় সময় ধরে টানা কাজ করে গেছেন রাজ্জাক ও কবরী। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একসঙ্গে করতেন তাঁরা। এ কারণে একটা ভালোবাসার জায়গাও নাকি দুজনের মধ্যে তৈরি হয়েছিল।

 

কবরী বললেন, ‘আমাদের দিনের একটা বিরাট সময় ধরে একসঙ্গে শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। প্রেমিক জুটি হয়ে পর্দায় গল্প উপস্থাপন করতে গিয়ে নিজেদের ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। আমি তো এমনও মনে করি, আমরা শুধু জুটি হিসেবে সফল হয়েছি তা কিন্তু নয়, অভিনয়শিল্পী হিসেবেও একটা সাক্ষরতা রেখে যেতে পারছি। এটাই আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দ।’

 

সিনেমার পর্দায় রাজ্জাক-কবরীকে প্রেমময় জুটি দর্শককে এতটাই বিমোহিত করেছে যে তাঁরা তাঁদের এই দুটি প্রিয় মানুষকে বাস্তবের জুটি হিসেবেও চাইতেন। এটা কবরী নিজেও উপলব্ধি করেছেন। মানুষ যখন এমন ভাবত, কবরী তখন কী ভাবতেন? ‘আসলে একটা পর্যায়ে গিয়ে মানুষ যখন একলা থাকে, তখন এক ধরনের চিন্তা আসে। আবার দুজন একসঙ্গে কাজ করলে আরেক রকম বাসা বাঁধে। মানুষ যখন এমন বলত, আমিও ভাবতাম, বিয়ে হলে তাহলে কি ভালো হতো?

 

আমি তাঁকে পর্দায়ও দেখেছি, বাস্তবেও দেখেছি। তখন আমি মোটেও রাজি না যে বিয়ে করতে। আমি কোনো দিন ভাবিনি।’

 

রাজ্জাক ও কবরী যখন পর্দা কাঁপানো জুটি, তখন তাঁরা বিবাহিত। দুজনেই নিজেদের সংসারের প্রতি ভীষণ দায়বদ্ধ ছিলেন। বললেন, ‘তিনি বিবাহিত, আমিও বিবাহিত। তারপরও বিবাহিত মানুষদের দ্বিতীয় বিয়ে হয়। কিন্তু আমি কোনো দিন ভাবিনি তাঁকে নিয়ে, আমার মনে হয় তিনিও ভাবেননি। কেন ভাবেননি, বিকজ হি ইজ ভেরি কমিটেড টু হিজ ফ্যামিলি। সিমিলারলি, আমি তো সাংঘাতিক কমিটেড ছিলাম সংসার নিয়ে।’

 

রাজ্জাক ও কবরী সিনেমার অবিচ্ছেদ্য জুটি যেমন ছিলেন, তেমনি তাঁদের মধ্য ঝগড়াও লেগে থাকত। এসব নিয়ে মান-অভিমানও নাকি তৈরি হতো। কবরী বললেন, ‘পরিচালক কামাল আহমেদ “অধিকার” সিনেমা বানানোর পর আমাকে ছাড়া ভাবতেই পারতেন না। পরের সিনেমা আমি আর রাজ্জাককে নিয়ে বানাবেন। সে সময় আবার রাজ্জাকের সঙ্গে আমার তুমুল ঝগড়া। সংশ্লিষ্ট সবার মাথায় হাত। কামাল ভাই চিন্তাই করতে পারতেন না, আমি তাঁর সিনেমায় কাজ করব না। এরপর তিনি আমার সঙ্গে সেই সিনেমায় বুলবুল আহমেদকে নিলেন আর রাজ্জাকের সঙ্গে শাবানা। সিনেমা দারুণ হিটও হলো।’

 

কবরী জানান, শুরুর দিকে যেসব সিনেমায় তিনি অভিনয় করতেন, সেসবে তাঁর নাম থাকত নায়কের নামের আগে। রাজ্জাক নাকি একটা সময় পর বায়না ধরলেন তাঁর নাম আগে যেতে হবে। এতে তিনি বেশ অবাক হন।

 

বললেন, ‘তখন তো আমার বয়স কম। রাজ্জাক আমার হিরো। সে কেন আমার সঙ্গে এমন করছে? মনের মধ্যে অভিমান জমতে থাকল। ছোট ছোট অভিমান আমাকে রাজ্জাক সাহেবের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে থাকল। আমি দর্শকদের একটা ভেদ ভাঙতে চাই, বলতে চাই, রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমার গোপন কোনো প্রেম নেই। আমাদের প্রেম ছিল পর্দায়। আমরা চোখে চোখে কথা বলতাম। একে অন্যের ইশারা বুঝতাম। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলতাম। মনে হতো, একে অপরের জন্য তৈরি হয়েছি।’

Other News