কখন কতটুকু ঘুমাবেন? স্বাস্থ্য News

কখন কতটুকু ঘুমাবেন?

সেদিন ঘুমের উপর বিবিসির একটি আর্টিকেল চোখে পড়ল – “The myth of the eight-hour sleep”।


গত দু’এক শত বছরের মধ্যে মানবজাতির ঘুমের রুটিনে কি কি পরিবর্তন এসেছে, এবং এর ফলে কি সমস্যা হচ্ছে, এসব নিয়ে দারুণ একটি গবেষণামূলক আর্টিকেল। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক, এবং ডাক্তারদের রেফারেন্স দিয়ে এখানে বলা হয়েছে যে, শিল্প বিপ্লবের পর মানবজাতির ঘুমের রুটিন ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। ফলে ইউরোপ সহ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এখন অ-প্রাকৃতিক এবং অস্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।


রাতের প্রথম অংশে ঘুম যেতে না পারলে ঘুমের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। অর্থাৎ, রাতের প্রথম অংশে ৪/৫ ঘণ্টা ঘুম যাওয়া আর রাতের শেষ অংশ থেকে দুপর পর্যন্ত ৭/৮ ঘণ্টা ঘুম যাওয়া একই কথা। 'একটানা ৭/৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হয়' বলে যে কথাটি আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, তা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে এ আর্টিকেলটি। ঘুম নির্ভর করে কোয়ালিটির উপর, কোয়ান্টাটির উপর নয়।

অ্যামেরিকার ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর রজার ইকার্চ [Roger Ekirch] এ নিয়ে একটি চমৎকার বই লিখেন। নাম – At Day's Close: Night in Times Past


রজার ইকার্চ ১৬ বছর গবেষণা করে এ বইটি লিখেন। তাঁর মতে, অতীতের মানুষেরা সন্ধ্যার পর অর্থাৎ সূর্যাস্তের দু’তিন ঘণ্টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তো। এরপর, ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা ঘুমাতো। তারপর, ঘুম থেকে উঠে ১ থেকে ২ ঘণ্টা ইবাদত বা ব্যক্তিগত কাজ করতো। তারপর, আবার কিছুক্ষণের জন্যে ঘুমাতো। এবং সকালে তাড়াতাড়ি উঠে যেতো।


এ কথাটি প্রমাণ করার জন্যে রজার ইকার্চ তাঁর বইতে ৫০০টি ঐতিহাসিক রেফারেন্স প্রদান করেন। ক্লাসিক্যাল বিভিন্ন সাহিত্যের বই, মেডিক্যাল বই, আদালতের নথিপত্র, নৃতাত্ত্বিক তথ্য ও ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ থেকে তিনি প্রমাণ করেন যে, আগেকার মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতো না; এবং একটানা ৭ বা ৮ ঘণ্টা ঘুমাতো না। আগেকার মানুষ প্রকৃতির সাথে ঘুমিয়ে যেত, প্রকৃতির সাথেই জেগে উঠতো। মাঝখানে দুই’এক ঘণ্টার জন্যে জেগে স্রষ্টার ইবাদত করতো অথবা ব্যক্তিগত কোনো কাজ সেরে নিতো। এটাই ছিল মানুষের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘুমের অভ্যাস।

কিন্তু, সুস্থ-স্বাভাবিক এই ঘুমের অভ্যাসটি ধ্বংস হতে শুরু হয় ১৭ শতাব্দীর শেষের দিকে। যখন শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। প্রথম ১৬৬৭ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় মোমবাতি লাগানো শুরু হয়। ২ বছর পর তেলের বাতি আবিষ্কার হয়। এরপর, লন্ডন সহ ইউরোপের প্রায় ৫০ টি শহরের রাস্তায় রাস্তায় তেলের বাতি লাগানো শুরু হয়। উদাহরণ স্বরূপ, Leipzig নামক জার্মানের ছোট্ট একটি শহরের কথা উল্লেখ করা যাক। এই শহরে মাত্র ১০০ জন মানুষ কাজ করতো। কিন্তু শহরটির বিভিন্ন রাস্তায় ৭০০টি বাতি বসানো হয়েছিলো।


এসব কৃত্রিম আলো সৃষ্টি করার কারণে মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক ঘুমের রুটিনটি পরিবর্তন হয়ে যায়। মানুষ আস্তে আস্তে ভাবতে শুরু করলো যে, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া মানে হলো সময় অপচয় করা। দিনের কাজ দিনের আলোর মধ্যে শেষ করে ফেলার যে তাড়না অতীতের মানুষের মধ্যে ছিল, তা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে অলসতা ও বিলাসিতা চলে আসে। দিনের কাজ দিনের আলোর মধ্যে শেষ না করে মানুষ তা রাতের জন্যে রেখে দিতো। ফলে অনিবার্য কারণেই রাতের ঘুমটি দিনের আলোর মধ্যে প্রবেশ করলো, এবং মানুষ তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক ঘুমের রুটিনটি হারিয়ে ফেলে।

১৯২০ সালের দিকে এসে শহরের মানুষ তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক ঘুমের নিয়মটি একেবারেই ভুলে গেল। সূর্যাস্তের ২/৩ ঘণ্টা পর ঘুমিয়ে যাওয়া, ৪/৫ ঘণ্টা ঘুমানোর পর দু’এক ঘণ্টার জন্যে রাত জেগে ইবাদত বা ব্যক্তিগত কাজ করা, এরপর আবার কিছুক্ষণের জন্যে দ্বিতীয় ঘুম দেওয়া, তারপর দিনের আলো আসার সাথে সাথে আবার জেগে উঠা – এ নিয়মগুলো তখন মানুষের কাছে কাল্পনিক মনে হতে লাগলো।


রাতের ঘুম চলে আসলো দিনের আলোতে, এবং দুই বা ততোধিক ঘুমের পরিবর্তে মানুষ একটি ঘুমের অভ্যাস করে ফেললো। মানুষ তাদের প্রাকৃতিক অভ্যাস ত্যাগ করলো, ফলে প্রকৃতিও মানুষের সাথে বিদ্রূপ আচরণ শুরু করলো। দিনের বেলা ঝিমুনি, মাথা ব্যথা, হতাশা, কাজে অমনোযোগ, অলসতা, দুর্বলতা, অযথা রাগান্বিত হওয়া সহ নানা কিছু মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হলো।

১৯৯০ সালে সাইকোলজিস্ট Thomas Wehr একদল মানুষের উপর গবেষণা পরিচালনা করেন। ঐ মানুষদেরকে প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা অন্ধকারে রাখা হত। এভাবে এক মাস রাখা হলো। ফলে, তাদের ঘুমের অভ্যাসটি পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পর পরেই ঘুমিয়ে পড়তো, ৪/৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে ১/২ ঘণ্টার জন্যে জেগে থাকতো। এরপর আবার দ্বিতীয় ঘুম যেতো, এবং সূর্যোদয়ের আগেই জেগে উঠতো। এই গবেষণাটির পর ঘুম বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘুমের রুটিন হলো এটাই।

অ্যামেরিকার অন্যতম একজন ‘ঘুম বিশেষজ্ঞ’ হলেন Dr Charles Czeisler। তাঁর মতে, ঘুম হচ্ছে সবচেয়ে ভালো এবং উপকারী ঔষধের নাম। সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের জন্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘুমানো উচিত। অবশ্যই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো উচিত। এবং দুপরের পর কিছুক্ষণ ঘুমানো উচিত। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত দুইবার ঘুমানো উচিত। চার্লস সিজিলার এর মতে, সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পরপরেই মানুষের ঘুমের হরমোনগুলো কাজ করতে শুরু করে। মানুষ যদি রাতের প্রথম অংশ না ঘুমায়, তাহলে ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও বিষণ্ণতা সহ অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। রাতের প্রথমাংশে ঘুমালে খুব সহজে এসব অসুখগুলো শরীরে দানা বাঁধতে পারে না।

অ্যামেরিকার Sleep Foundation এর তথ্য অনুযায়ী, মানুষ রাতের প্রথমাংশে ঘুম না যাবার প্রধান কারণ হলো ইন্টারনেট, স্মার্ট ফোন, ই-রিডার, ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং টেলিভিশন জাতীয় টেকনোলোজিক্যাল পণ্য সমূহের ব্যবহার। ভালো ঘুম যাবার লক্ষে সূর্যাস্তের সাথে সাথে এসব টেকনোলোজিক্যাল পণ্য সামগ্রীর ব্যবহার থেকে নিজেকে দূরে রাখা উচিত। স্মার্ট ফোনের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আসক্তি নিয়ে মনোবিজ্ঞানী Jean M. Twenge একটি চমৎকার গবেষণামূলক বই লিখেন। বইটির নাম – iGen অর্থাৎ “ইন্টারনেট প্রজন্ম”। তাঁর মতে, স্মার্ট ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে তরুণ প্রজন্ম অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ তিনি বলেন, ইন্টারনেট প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যে বয়সে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার কথা ছিল, সে বয়সে তারা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাচ্ছে না। এবং ইন্টারনেট প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সুস্থ-স্বাভাবিক সামাজিক আচরণেও অভ্যস্ত হতে পারছে না। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন যে, ই-প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা রাত জেগে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করছে, ফলে তারা নিয়মিত ও যথেষ্ট ঘুমাতে পারছে না l জিন টুইঙ্গের মতে, ইন্টারনেট প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যতবেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে, ততবেশি তারা অসুখী, একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা অনুভব করছে, এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।

তাড়াতাড়ি ঘুমানোর কিছু কৌশল
১.মাগরিবের আগেই রাতের খাওয়া খেয়ে ফেলা।
২.সন্ধ্যার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মোবাইল ও ল্যাপটপ বন্ধ করে অর্থসহ কোর’আন পড়তে শুরু করা।
৩.ইশার পর ঘুমানোর জন্যে শুয়ে দরুদ শরীফ ও বিভিন্ন দোয়া পড়ার পর, ৩৩ বার সোবহান আল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবর পড়তে শুরু করা। তাড়াতাড়ি ঘুমের জন্যে এটা খুবই কার্যকর একটি পদ্ধতি। প্রতিদিন এগুলো পড়ে শেষ করার আগেই ঘুম চলে আসবে ইনশাআল্লাহ ।

কোর’আনের দুটি সূরার দুটি অংশ দিয়ে শেষ করছি, আল্লাহ তায়ালা বলছেন –
يَٰٓأَيُّهَا ٱلْمُزَّمِّلُ ﴿١﴾ قُمِ ٱلَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًۭا ﴿٢﴾ نِّصْفَهُۥٓ أَوِ ٱنقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا ﴿٣﴾ أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ ٱلْقُرْءَانَ تَرْتِيلًا
“হে বস্ত্রাবৃত! রাতের কিছু অংশ পর জেগে উঠ। অর্ধ রাত অথবা তার একটু কম বা বেশি সুস্পষ্টভাবে কোর’আন আবৃতি কর।” [সূরা ৭৩ / মুযযাম্মিল – ১ থেকে ৪]
وَمِنَ ٱلَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِۦ نَافِلَةًۭ لَّكَ عَسَىٰٓ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًۭا مَّحْمُودًۭا
রাত্রির কিছু অংশ কোর'আন পাঠ সহ জাগ্রত থাক। এটা তোমার জন্যে নফল কাজ। সম্ভবত তোমার পালনকর্তা তোমাকে প্রশংসিত স্থানে পৌঁছিয়ে দিবেন। [সূরা ১৭/বনী ইসরাঈল]

জোবায়ের আল মাহমুদ

Other News