সর্বোচ্চ বেতন-ভাতাপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যাংকের শীর্ষ ১০ প্রধান নির্বাহী অর্থনীতি News

সর্বোচ্চ বেতন-ভাতাপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যাংকের শীর্ষ ১০ প্রধান নির্বাহী

 

বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব পালন করছেন আলী রেজা ইফতেখার। ২০০৭ সাল থেকেই এ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০১৬ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে তার বেতন-ভাতা ছিল ২ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার ১৯৪ টাকা। এ হিসাবে বেতন-ভাতা বাবদ আলী রেজা ইফতেখারকে প্রতি মাসে গড়ে ১৭ লাখ ১ হাজার ৯৯ টাকা দিয়েছে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ বেতন-ভাতাপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী। এর আগে ২০১৫ সালেও ১ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৮ টাকা বেতন-ভাতা নিয়ে দেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতনধারী প্রধান নির্বাহী ছিলেন আলী রেজা ইফতেখার।

দেশী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের মধ্যে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা পান দ্য সিটি ব্যাংকের সোহেল আরকে হোসেন। উচ্চবেতন-ভাতায় শীর্ষ ১০ প্রধান নির্বাহীর মধ্যে এর পরের স্থানগুলোয় রয়েছেন যথাক্রমে— মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আনিস এ খান, ব্যাংক এশিয়ার মো. আরফান আলী, এক্সিম ব্যাংকের ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া, আইএফআইসি ব্যাংকের এম শাহ আলম সারওয়ার, উত্তরা ব্যাংকের মোহাম্মদ রবিউল হোসেন, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ফরমান আর চৌধুরী, ওয়ান ব্যাংকের এম ফখরুল আলম ও ব্র্যাক ব্যাংকের সেলিম আরএফ হোসেন।

প্রধান নির্বাহীদের বার্ষিক বেতন-ভাতার পরিমাণ ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হয়। দেশের সরকারি-বেসরকারি ৪৮টি ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দ্য সিটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সোহেল আরকে হোসেন গত বছর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংক থেকে পেয়েছেন ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

অর্থাত্ প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন।

প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতা বাবদ তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের। ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী আনিস এ খান ২০১৬ সালে বেতন-ভাতা বাবদ পেয়েছেন ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

এ হিসাবে বেতন-ভাতা বাবদ মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক প্রতি মাসে এ ব্যাংকারকে পরিশোধ করেছে গড়ে ১৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এর আগে ২০১৫ সালে প্রধান নির্বাহী হিসেবে আনিস এ খান ১ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পেয়েছিলেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডির পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছেন আনিস এ খান।

প্রধান নির্বাহীদের বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন প্রধান নির্বাহীকে একটি ব্যাংকের সবকিছু নখদর্পণে রাখতে হয়। কারণ ব্যাংকের যেকোনো ভালো-মন্দের দায়দায়িত্ব প্রধান নির্বাহীর ওপর বর্তায়। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে প্রায় তিন দশক চাকরি করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন ব্যাংকার এমডির দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু সে সময় এমডিরা ব্যাংকের নিয়মিত কর্মকর্তা না হয়ে বরং চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। এ কারণে এমডিরা নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা ছাড়া অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। এমডিদের কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। এছাড়া বেতন থেকে উচ্চহারে সরকারকে কর পরিশোধ করতে হয়। সব মিলিয়ে ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতা অন্যান্য খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শীর্ষ নির্বাহীর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। প্রধান নির্বাহী মো. আরফান আলী গত বছর বেতন-ভাতা হিসেবে ব্যাংকটি থেকে পেয়েছেন ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।

এ হিসাবে ব্যাংক এশিয়া থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১৩ লাখ ৭ হাজার টাকা আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন এ ব্যাংকার।

২০১৬ সালে উচ্চবেতনভুক্ত প্রধান নির্বাহীদের মধ্যে পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছেন এক্সিম ব্যাংকের ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া। এক্সিম ব্যাংক গত বছর প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় করেছে ১ কোটি ৫১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

সে হিসাবে ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ব্যাংক থেকে বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে গড়ে ১২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা পেয়েছেন। ২০১৫ সালে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত ব্যাংকটি শীর্ষ নির্বাহীর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় করেছিল ১ কোটি ২২ লাখ টাকা।

এক্সিম ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর প্রায় সমপরিমাণ বেতন পেয়েছেন আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি ও সিইও এম শাহ আলম সারওয়ার। বেতন-ভাতা বাবদ ২০১৬ সালে তিনি পেয়েছেন ১ কোটি ৫১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

এ হিসাবে আইএফআইসি ব্যাংক প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় করেছে ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

প্রতি মাসে গড়ে ১১ লাখ ২৯ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পেয়েছেন উত্তরা ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল হোসেন। ২০১৬ সালে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বেতন-ভাতা নিয়ে উচ্চবেতনভুক্ত শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে সপ্তম স্থানে রয়েছেন তিনি।

শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন ফরমান আর চৌধুরী। বেতন-ভাতা বাবদ গত বছর ব্যাংকটি থেকে তিনি পেয়েছেন ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

এ হিসাবে প্রতি মাসে তিনি গড়ে বেতন-ভাতা পেয়েছেন ১১ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

প্রতি মাসে গড়ে ১১ লাখ ১১ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পেয়েছেন বেসরকারি খাতের ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. ফখরুল আলম। ২০১৬ সালে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংকটি থেকে তিনি পেয়েছেন ১ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। উচ্চবেতনভুক্ত দেশের ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের মধ্যে তার অবস্থান নবম।

বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সেলিম আরএফ হোসেন। ২০১৬ সালে ব্যাংকটি থেকে তিনি বেতন-ভাতা বাবদ আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন ১ কোটি ৩৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে ব্র্যাক ব্যাংক প্রধান নির্বাহীকে বেতন-ভাতা বাবদ পরিশোধ করেছে ১১ লাখ ৯ হাজার টাকা।

শীর্ষ নির্বাহীদের বেতন-ভাতার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এক ব্যাংকের এমডি কিংবা ডিএমডিকে উচ্চবেতন দিয়ে অন্য ব্যাংক টেনে নিয়ে যাচ্ছে। টানাটানির কারণে ব্যাংকের এমডিদের উচ্চবেতন দিতে হচ্ছে।

ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়া ও যোগ্য প্রধান নির্বাহী সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই এমডিদের বেতন বাড়াচ্ছে পর্ষদ।

তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতা নিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। একটি ব্যাংকের এমডির বেতন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কত হবে, নীতিমালায় তার বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে পারে।

কারণ ব্যাংক এমডিদের বিদ্যমান বেতন দেশের কোনো বেতন কাঠামোর সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

দেশের বেসরকরি খাতের প্রায় সব ব্যাংকই প্রধান নির্বাহীদের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে ১ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী পেয়েছেন ১ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এমডি মো. হাবিবুর রহমান ১ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এমডি কাজী মসিহুর রহমান ১ কোটি ২৯ লাখ ৮২ হাজার, এবি ব্যাংকের এমডি মশিউর রহমান চৌধুরী ১ কোটি ২৯ লাখ, ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ১ কোটি ২৮ লাখ ৯০ হাজার ও যমুনা ব্যাংকের এমডি শফিকুল আলম ১ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সে হিসাবে প্রধান নির্বাহীদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে গড়ে ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছে এ ব্যাংকগুলো।

অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০১৬ সালে সাইথইস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি সহিদ হোসেন ১ কোটি ১৯ লাখ ৭৫ হাজার, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মো. শফিকুর রহমান ১ কোটি ১৬ লাখ ৩৪ হাজার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) সাবেক এমডি মোহাম্মদ আলী ১ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ১ কোটি ১১ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের এমডি খন্দকার ফজলে রশিদ ১ কোটি ৮ লাখ, প্রাইম ব্যাংকের এমডি আহমেদ কামাল খান চৌধুরী ১ কোটি ৭ লাখ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সাবেক এমডি কে শামসি তাবরেজ ১ কোটি ৬ লাখ, পূবালী ব্যাংকের এমডি মো. আবদুল হালিম চৌধুরী ১ কোটি ৫ লাখ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এমডি সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী ১ কোটি ৩ লাখ ও ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক এমডি এএফএম শরিফুল ইসলাম ১ কোটি ১ লাখ টাকা বেতন-ভাতা হিসেবে নিজ নিজ ব্যাংক থেকে পেয়েছেন।

নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি বেতন পেয়েছেন এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমান। গত বছর তিনি ব্যাংক থেকে ১ কোটি ২৯ লাখ ৫ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পেয়েছেন। বেশি বেতন-ভাতার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আহসান-উজ জামান।

২০১৬ সালে তিনি ব্যাংকটি থেকে বেতন-ভাতা বাবদ ১ কোটি ২৫ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এছাড়া সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের এমডি মো. রফিকুল ইসলাম ১ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার ও এনআরবি ব্যাংকের সাবেক এমডি মুখলেসুর রহমান ১ কোটি ৭ লাখ টাকা বেতন-ভাতা বাবদ পেয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, সরকারি-বেসরকারি যেকোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়। কোনো ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করে এমডি নিয়োগের অনুমতি চেয়ে আবেদন পাঠালে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই করে নিয়োগ অনুমোদন করে।

এক্ষেত্রে এমডিদের বেতন কত হবে, সেটিও ব্যাংকের পক্ষ থেকেই নির্ধারণ করা হয়। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকপক্ষ থেকে এমডিদের বেতন কাঠামো নিয়ে কোনো আবেদন জানালে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যালোচনা করে দেখবে। বণিক বার্তা

Other News