যে কোন কিছুর মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিই খারাপ! মতামত News

যে কোন কিছুর মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিই খারাপ!

Fakhrul Islam Hemel

গত কয়েক বছর ধরে দেখছি, আমরা ক্রিকেটে একধরনের বুদ হয়ে থাকি! আমার কাছে যে কোন কিছুর মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিই খারাপ! আবার, আসক্তি আরেকটি দিক হচ্ছে, এটা যে আসক্তি তা আসক্তিতে অভ্যস্ত মানুষটা টের পায় না! এখন, অনেকেই বলতে পারেন, এটা আসক্তি নয়! কেন? তা মাত্রই বললাম।

ছাত্র-ছাত্রীরা খেলা চলাকালীন সময়ে ক্লাস করতে চায় না।অনুরোধ করে ক্লাস ছেড়ে দেয়ার, আর যদিও করে একটা বড় অংশ মোবাইলে স্কোর আপডেটেই ব্যস্ত থাকে! আবার, আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ খেলাগুলোর দিন ক্লাসে উপস্থিতিও কম হয়। অফিস-আদালতেও একই অবস্থা! আপনি গুরুত্বপূর্ণ খেলাগুলোর দিন অনেককেই বলতে দেখবেন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে!আবার, যদি নাও নেয়, অর্ধ-দিবস অফিস করে। গুরুত্বপূর্ণ খেলার দিন অফিস ফেরার পথে রাস্তা-ঘাট ফাঁকা ফাঁকা পাবেন।ক্রিকেট বা যেকোন খেলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সমর্থক বা দর্শক দরকার কিন্তু পাগলামো,ডুবে থাকা বা বুদ হয়ে যাওয়া নয়!


Tourism Management-এ একটা টার্ম আছে, 'Nation Branding'! অনেকেই এখানে বলে ক্রিকেট আমাদের দেশকে ব্রান্ডিং করেছে! ভালো কথা করুক না! টিমটা যদি ব্রান্ডিং করে করুক, টিমটাকেই করতে দেন যেমন করছে অন্যান্য দেশগুলো।আমরা সবাই মিলে তো এই ব্রান্ডিংয়ের বিপরীতে কাজ করতে পারি না। ভূ-মধ্যসাগরে যে লাশগুলো ভাসে তারা কিন্তু ক্রিকেটে উন্নতি করার পরও সাগরে ভাসছে! ব্রান্ডিংটাও হয়েছে ফলাও করে আল-জাজিরা, সিএনএন, বিবিসিতে!! অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডের কয়টা মানুষ সাগরে ভাসে, ক্রিকেটতো তারাও খেলে, সমর্থনতো তারাও করে! তাদেরকে দুনিয়া চিনেছে কি দিয়ে??

অর্থনীতিতে একটা টার্ম আছে, Opportunity Cost! যার অর্থ হচ্ছে সুযোগ ব্যয়! আপনি একই জিনিস থেকে একই সময়ে দুটি বিষয় লাভ করতে পারেন না; একটি পেতে আপনাকে অন্যটি ছাড়তে হয়। এখন, এই ক্ষেত্রে আমরা কি পেতে কি ত্যাগ করছি?

একটা ODI ম্যাচ সম্পূর্ণ হতে ৮-৯ ঘন্টা লাগে, টি২০ ম্যাচে ৩ ঘন্টা আর একটা টেস্ট ম্যাচ ৫ দিন! আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ, বিশেষতঃ ছাত্র-ছাত্ররা প্রায় প্রত্যেকটা খেলা দেখে! ক্রিকেটকে বিশ্বায়নের জন্য প্রায় প্রত্যেকটা দেশ বিশেষায়িত টি২০ লীগ আয়োজন করছে, যেমনঃ IPL, BPL, Big Bash, CPL, APL, PSL, SLPL ইত্যাদি। আমি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বলি, আমাদের দেশের দর্শকরা অন্ততঃ BPL ও IPL টুর্নামেন্টের খেলাগুলো দেখে আর এই দুটি টুর্নামেন্টের ব্যাপ্তি থাকে দেড় মাস, মানে দুটি মিলে ৩ মাস!আর, বাংলাদেশ জাতীয় দলের বিভিন্ন দ্বী-পক্ষীয় সিরিজ বা কোন টুর্নামেন্টতো আছেই! আর, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখলেই বুঝবেন এর ইনভল্বমেন্ট কোন পর্যায়ের!

এতে করে অনেক কর্মঘন্টা নষ্ট হয় একবার ভেবে দেখেছেন? ক্রিকেট এগিয়ে যাবে ঠিকই, আমরা কি এগিয়ে যাবো সমান তালে? আমি কিন্তু ক্রিকেটের বিপক্ষে কথা বলছি না! তবে পাশাপাশি আমাদের অন্যান্য জিনিসও চিন্তা করতে হবে। যদি খেলার কথাই ধরি, ফুটবলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলো, আর্চারিতে বিশ্বমঞ্চে প্রথমবারের মত পদক অর্জন করলো কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুনতো, আপনাদের মধ্যে ক্রিকেটের জয়ের মত আবেগ কাজ করেছে কিনা? অনেকেরই উত্তরটা হবে, আসলেই তো, এভাবে তো ভেবে দেখি নাই? তার মানে খেলাটা আপনাকে বুদ করেছে, লজিক্যাল চিন্তা ব্যাহত করছে, আর নেশাই মানুষকে লজিক্যাল চিন্তা করতে ব্যাহত করে!!


আইপিল বা বিপিএল চলাকালীন সময়ে লক্ষ্য করবেন, পেপার পত্রিকায় বেশ কিছু রিপোর্ট এসেছে যে একে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় জুয়া চলে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এই জুয়া নিয়ে খুনাখুনির খবরও মেলে! এতে বুঝা যাচ্ছে, সামাজিক অবক্ষয় রীতিমতো বেগবান হচ্ছে! ক্রীড়া বিনোদনের উত্তম মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম। খেলাধূলার মাধ্যমে যুব সমাজ মাদক ও সামাজিক নানা অবক্ষয়ের মাধ্যমগুলো থেকে দূরে থাকে।একটি সুস্থ যুব সমাজ গড়তে খেলাধূলার বিকল্প নেই।কিন্তু এখন যুবকরা খেলা খেলে না, দেখে! শুধুমাত্র খেলা দেখে আবার খেলাধূলার যে ভূমিকা তা পূরণ হয় না। তাই, আমাদের সবার উচিৎ এই বিষয়গুলো নিয়ে রিথিন্ক করা। আর, অভিভাবকদের উচিৎ মোবাইলের আসক্তির মত অতিরিক্ত সময় আপনার সন্তান মাত্রাতিরিক্ত ক্রিকেটে বুদ কিনা তা খেয়াল রাখা।

আমাদের শৈশবে চাচা-চোধুরীর কমিক্স পড়তাম, পড়তাম সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সব পাঠ।কিন্তু এখনকার, ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই প্রবনতা নেই বললেই চলে! অনেক বই আছে যেটা শুধুমাত্র একটা ক্রিকেট ম্যাচের সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব! তাহলে চিন্তা করুন, আপনি ১০০ ম্যাচ দেখার বদলে যদি ১০০ টা বই পড়তেন আর এভাবে যদি ৫ কোটি শিক্ষিত তরুণ ১০০ করে বই শেষ করতো, তাহলে সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে ঠেকাতো?আর, এভাবেই একটা জাতি জ্ঞান নির্ভর হয়ে উঠে! আমরা যখন শত শত কর্ম-ঘন্টা নিচক ম্যাচ দেখে নষ্ট করছি, তখন চিন্তা করুন, পশ্চিমাদের ল্যাবের বা লাইব্রেরির কর্মব্যস্ত ঘন্টাগুলোর কথা! আসলে, কেউ স্রেফ এই বিষয়টার অর্থনৈতিক প্রতিফল বা প্রভাব কনভার্ট করেনি বিধায় আমাদের উপলব্ধি করতে কষ্ট হচ্ছে!
নির্বাচন একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন। অথচ,উন্নত বিশ্বে নির্বাচনের দিনও প্রায় সব অফিস-ব্যবসা খোলা রাখে এবং তারা এমনকি ভোট দিতেও অনাগ্রহী হয়ে উঠে বা সময় করে উঠতে পারে না!

আমরা উন্নত হতে চাই কিন্তু এর জন্য দরকার জ্ঞান নির্ভর সমাজ।তাই, এই জ্ঞান নির্ভর সমাজ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে আর সমাজের ইভিল জিনিসগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে আমাদের ভালোর জন্যই।।সামনে এগিয়ে যেতে আপনাকে 'আউট অফ দ্যা বক্স' চিন্তা করতেই হবে!

বিঃদ্রঃ অনেকেই ভাবতে পারেন আমি ক্রিকেট ফ্যান নই তাই বিরক্তি নিয়ে ক্রিকেটের বিষয়টাই সামনে এনেছি।তাদের জন্য আমার উত্তর হচ্ছেঃ জীবনে এই একটা খেলাই সবচেয়ে বেশি খেলেছি আর দেখেছি! আর, আমার প্রফাইলে ঘুরে আসুন, ফিচার্ড ফটোতে একটা ছবিই শুধু আমাকে ছাড়া আছে, সেটা ম্যাশ! লিখেছি,কারন,ভোক্তভুগিরাই উপলব্ধিটা কাছ থেকে করতে পারে।

Other News